ঢাকা রবিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২১ ইং | ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

নীলফামারীতে উড়ছে নতুনের কেতন, টেনশন নেই প্রবীনের; জয়ের হাল ছাড়েননি মাঝবয়সী মেয়র প্রার্থী

প্রকাশিত: ২২ নভেম্বর ২০২১, রাত ১১ঃ০৯

২৮ নভেম্বর নীলফামারী পৌরসভার নির্বাচন। শেষ সময়ে ভোটের নানা সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। কাঁক ভোড় থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত পাড়া-মহল্লা, অলি-গলিতে ভোটারদের দ্বারে ছুটছেন প্রার্থীরা। সাত বারের নির্বাচিত মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়ছেন দুই সতন্ত্র প্রার্থী। নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে দিচ্ছেন নানা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি।থেমে নেই ভোটাররাও।এতে মন গলছেনা তাদের। দেখে শুনে এবার নির্বাচিত করবেন তাদের যোগ্য প্রার্থীকে। আর ভোটের মাঠ সমতল নয় বলে অভিযোগ অন্য প্রার্থীদের।

 

গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত পৌরসভার বিভিন্ন স্থানে অন্ততশতাধিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর ভাবমূর্তি ও উন্নয়নকেই বেশি গুরুত্ব দেবেন তারা।

 

স্থানীয় নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যেহেতু সরকার পরিবর্তন হয় না, তাই দলীয় অনেক নেতা-কর্মীও উন্নয়নের স্বার্থে দলের বাইরে ভোট দিয়ে থাকেন। তাই এবারের পৌরসভা নির্বাচনে নবীনে প্রবীনে লড়াই হবে বলে মনে করছেন তারা।

 

পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন ভোটার শিলা রানী, রুবিনা আফরোজ, রাত্রী মহন্তসহ অনেকেই জানালেন, জীবনের প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছেন। তাও আবার ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে। এই প্রযুক্তির সাথে খুব একটা পরিচয় না থাকলেও মানুষের মুখে ধারনা নিয়েছেন। তাই সৎ, যোগ্য, নিষ্ঠাবান প্রার্থীকে ভোট দেবেন। যার দ্বারা পৌরবাসীর উন্নয়ন হবে, পানি সমস্যা দূর হবে, থাকবেনা জলজট, সহজ যোগাযোগ স্থাপন, স্বাস্থ্য সেবাসহ সর্বোপরি সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে, এমন প্রার্থীকেই ভোট দেবেন।

 

৭ নম্বর ওয়ার্ডেও বাসিন্দা রবিউল ইসলাম, আফসার আলী, মনোয়ারা বেগম জানিয়েছেন, এক জীবনে তারা ১২ থেকে ১৫ বার ভোট দিয়েছেন কিন্তু অধিকার আদায় হয়নি তাদের। ভোটের সময় পালা করে ছুটে আসেন তাদের কাছে, ধনী গরীবের ভেদাভেদ ভূলে জরিয়ে ধরে ভোট প্রার্থনা করেন। ওয়াদা করেন সমস্যা সমাধানের। কিন্তু ভোট ফুরালেই ফুরিয়ে যায় তাদের সব নাগরিক ভাবনা। 

 

তাই এবার এমন প্রার্থী চান, যে সাধারণ মানুষের উন্নয়নে নিজেকে সব সময় সংযুক্ত রাখবেন, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন। এখনও পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়ক কাঁচা। পানি নিক্সাশনের কোন ব্যবস্থা নেই। নেই শিশু বান্ধব কোন পরিবেশ। একটি মাত্র বড় মাঠ থাকলেও সেখানে সাধারনের যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। শহরের মানুষ ও ভাসমানরা দখলে নিয়েছেন।

 

পৌরসভার শাহিপাড়া, কুখাপাড়া, সবুজপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী রফিকুল ইসলাম, সালমা বেগম, সাদেকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এমন একজনকে মেয়র হিসেবে দেখতে চাই, যিনি স্বপ্ন দেখবেন এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাখবেন। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি নাগরিকদের নিয়ে আলোচনায় বসবেন, কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবেন, পাঁচ বছরের মধ্যে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করবেন। তরুনদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসংস্থানের পথ দেখাবেন।

নীলফামারী পৌরসভায় এবারই প্রথমবারের মতো ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে সাত বারের নির্বাচিত মেয়র, জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বাংলাদেশ পৌরসভা সমিতির সভাপতি দেওয়ান কামাল আহমেদ প্রতিদ্বন্দিতা করছেন নৌকা প্রতীক নিয়ে। বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে (কম্পিউটার প্রতীক)জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল আলম ও তরুন নেতা নুরুজ্জামান বুলেট লড়ছেন(নাড়কেল গাছ) প্রতীক নিয়ে। গত দুই ধাপে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জহুরুল আলম সরকার দলীয় এই হেভিওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়লেও কপাল ফেরেনি তার। দলীয় কোন্দল আর পদের লাড়াইয়ে হেরেছেন তিনি। তবে এবার বিএনপি দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় বড় বে-কায়দায় এই প্রার্থী। বয়ে গেছে পারিবারিক ঝড়ও। এরপরেও মাঠের হাল ছাড়েননি তিনি। বুকভড়া আসা নিয়ে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে ভোটারদের প্রভাবিত করার। সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত তার।

 

এদিকে, তরুন রাজনীতির ধারক, সাবেক ছাত্র নেতা ঠিকাদার নুরুজ্জামান বুলেট প্রথমবারের মতো ভোটের রাজনীতিতে ভাগ্য নির্ধারনে নেমেছেন। তার প্রতীকে হাওয়া লেগেছে। নবীন প্রবীনের সূরের মূর্ছনায় বাতাসে দোল খাচ্ছে নাড়কেল গাছ। এই প্রার্থী বয়সে নবীন হলেও এলাকায় রয়েছে তার ব্যাপক পরিচিতি।

 

পরিক্ষিত নৌকার মাঝি দেওয়ান কামাল আহমেদ পার করেছেন ভোটের অনেক পরিক্ষা। পারিবারিক ও পরক্ষভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় তিনি। আছে কৃষি জ্ঞানও। মানুষের মন যোগাতে অনেকটাই পারদর্শী তিনি। তার সময়ে তৃতীয় শ্রেনীর পৌরসভাকে উন্নিত করেছেন প্রথম শ্রেনীতে। ১৯৮৯ সালে প্রথম পৌর পিতা নির্বাচিত হন এই নেতা। এর পর থেকে মাঠে শক্তিশালী কোন প্রতিদ্বন্দি প্রার্থী না থাকায় গত সাত ধাপে টানা শাসন করছেন এই পৌরসভাকে তিনি। 

 

১৯৭২ সালে নীলফামারী পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ৪৯ বছরে এই শহরে যেমন উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল তা পায়নি পৌরবাসী। নানা সমস্যায় জর্জরিত এই পৌরসভার উন্নয়নই এখন একমাত্র চাওয়া ভোটারদের। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর নীলফামারী জেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক আনোয়ারুল আলম জানিয়েছেন, অন্যান্য নির্বাচনের তুলনায় এবারের নীলফামারী পৌরসভা নির্বাচন অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবারের মতো পৌরবাসী ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে তাদেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এই মেশিন সর্ম্পকে খুব বেশি ধারনা নেই ভোটারদের। বিশেষ করে নতুন, বয়স্ক ও কম শিক্ষিত ভোটাররা বিব্রতকর অবস্থায় পরবেন। এছাড়া নৌকা প্রতীকের প্রার্থী অনেক শক্তিশালী। মাঠ পর্যায়েও রয়েছে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে একজন নবীন ও অন্যজন মাঝবয়সী। তবে সে ক্ষেত্রে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই হলে জমতো ভোটের মাঠ। এর পরেও অধিকার আদায়ে পৌরবাসী তা বিচার-বিবেচনা করবেন।

 

জেলা রির্টানিং অফিসার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন, সীমানা জটিলতার কারনে ২০১১ সালের ১২ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের পর থেকে আর কোন নির্বাচন হয়নি। ২৮ নভেম্বর পৌর এলাকার ৯ ওয়ার্ডের ১৬ কেন্দ্রে ইভিএম এর মাধ্যমে নেয়া হবে ভোট। উৎসব মুখোর পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রস্তুত তারা।

 

এবারের নির্বাচনে ৩ মেয়র, ৬০ সাধারণ সদস্যসহ সংরক্ষিত আসনে লড়ছেন ২২ জন প্রার্থী। ৩৫ হাজার ৯শ ৮১ ভোটারের মধ্যে নারী ১৮ হাজার ৫শ ৬৫ ও পুরুষ ১৭ হাজার ৪শ ১৬ জন ভোটার রয়েছে।