ঢাকা শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১ ইং | ১ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মেক্সিকোর গুয়ানাজুয়াতোর চিৎকার করা বিখ্যাত মমিদের ভয়ঙ্কর গল্প

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, বিকেল ৫ঃ২৮

মেক্সিকোতে মমি?! হ্যাঁ! গুয়ানাজুয়াতোর মমির মুখের অভিব্যক্তিগুলো যেন জানান দেয় এর পেছনে রয়েছে কোন নিষ্ঠুর কাহিনী। পৃথিবীজুড়ে এই মমিদের মুখের অভিব্যক্তি বিখ্যাত। তাদের চাহনি বলে দেয় যে, কফিনে জেগে ওঠার পর কেমন ছিল তাদের অনুভূত ভীত-সন্ত্রস্ত চেহারা। কফিনে জেগে উঠে বুঝতে পারে যে তাদের জীবিত কবর দেওয়া হয়েছে। গুয়ানাজুয়াতো মমি যাদুঘরে যে মেক্সিকান মমিগুলি দেখতে পাওয়া যায় তাদের সকলেই যেন একটি ভয়ঙ্কর গল্প বিলিয়ে দেয়। 

 

গুয়ানাজুয়াতো মমির পেছনের কাহিনী কী?

সালটি ছিল ১৮৩৩। স্থান- গুয়ানাজুয়াতো, মেক্সিকোর কেন্দ্রে একটি উপনিবেশিক শহর। একদিন নগরবাসী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যেতে লাগলো। প্রথমে খুব অল্পবয়সী বা খুব বয়স্ক ব্যক্তি মারা যায়, তারপরে অন্য সবাই। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে যায়। এটা ছিল কলেরা! আতঙ্ক দেখা দিল। মানুষ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সব চেষ্টা করেছিল। যেমন, উদ্ভট মন্ত্র নিক্ষেপ, অদ্ভুত এবং অকেজো ওষুধ প্রয়োগ, এবং প্রার্থনার পর প্রার্থনা, অনেক প্রার্থনা। তারপরও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। মৃতদেহ স্তূপ করার সাথে সাথে, বিধ্বস্ত জনগোষ্ঠী রোগের বিস্তার রোধে যত দ্রুত সম্ভব তাদের দাফন করেছে। মৃতদের গণকবর দেওয়া হয়েছিল, একাধিক লাশ একটা সমাধিগৃহে দাফন করা হচ্ছিল, মৃতদেহগুলি অগভীর কবরে দাফন করা হয়েছিল। 

 

নির্বীজিত মৃতদেহ আবিষ্কার

সময় কেটে গেল এবং কলেরা মহামারীর কথা বেশিরভাগই ভুলে গিয়েছিল। ১৮৭০-এর দশকে স্থানীয় সরকার এমন লোকজনকে কর আরোপ করতে লেগেছিল যারা এতদিন পূর্বের সমাহিত তাদের আত্মীয় -স্বজনের কবরের চিরকালীন যত্ন অব্যাহত রাখতে চাইতো। যদি আত্মীয়রা কর দিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হয়, তবে মৃতদেহগুলি প্রোথিত বা দাফন করা হবে না, বরং নির্বীজিকরণ করা হবে বলা হয়। যে সমস্ত লাশের জন্য কর পরিশোধ করা হয়নি তাদের নির্বীজিত এবং একটি গুদামে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। দেখা যায়, নব্বই শতাংশ লোকের মৃতদেহের অবশিষ্টাংশই নির্বীজিত করা হয়েছিল কারণ তাদের আত্মীয়রা কর দেননি। এর মধ্যে মাত্র দুই শতাংশ প্রাকৃতিকভাবে মমি করা হয়েছে।

একবার নির্বীজিত করা হলে শহরবাসী দেখে অবাক হয়ে যায় যে মৃতদেহগুলি অসাধারণভাবে সংরক্ষিত ছিল। আসলে, তাদের মমি করা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করেছেন যে মাটির অনন্য গঠন, শুষ্ক, কম আর্দ্র আবহাওয়া এবং গুয়ানাজুয়াতোর অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬০০০ ফুট উচ্চতা মৃতদেহগুলিকে পচন থেকে রক্ষা করেছে। 

 

গুয়ানাজুয়াতোর মমির বিখ্যাত হয়ে ওঠা

১৮৬৫ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে মৃতদেহগুলি জীবাণুমুক্ত/ নির্বীজিত করা হয়েছে বলে মনে হয়। মমি করা লাশগুলি একটি ভবনে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। স্থানীয় জনগণ গুয়ানাজুয়াতোর এই মমিতে মুগ্ধ হয়ে তাদের দেখতে উঁকি দিতে গুদামে ঢুকে পড়তে শুরু করে। কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পর্যটকরা স্থানীয় তত্ত্বাবধায়কদের মমি দেখার অনুমতি দেওয়ার জন্য কয়েক পেসো দিতে অফার করেন এবং পেসো দিয়ে দিয়ে অনেকেই এগুলো দেখার জন্য আসতে শুরু করেন।

১৯০০ এর দশকে লোকদের এই ঘরটি তুমুল আকর্ষণ করতে শুরু করেছিল। অবশেষে, পর্যটকদের ঝাঁকে ঝাঁকে আসা যেন একটি স্রোতে পরিণত হয়। এজন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভর্তি ফি সহ একটি আনুষ্ঠানিক যাদুঘর প্রতিষ্ঠা করে যা শহরের জন্য আয়ের মাধ্যম তৈরি করে। এভাবেই গুয়ানাজুয়াতো মমির জাদুঘরটি অস্তিত্ব পায়। এই জাদুঘরটি 'এল মিউজিও দে লাস মোমিয়াস' ("দ্য মমিজ মিউজিয়াম") নামে পরিচিত হয়ে উঠে। কয়েক দশক ধরে মমিগুলিকে দড়ির সাহায্যে আটকে রেখে দেয়ালের বিরুদ্ধে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছিল। দর্শনার্থীরা তাদের কাছাকাছি যেতে পারত। কিছু পর্যটক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে মমি অংশগুলি বিচ্ছিন্ন করে নিতে শুরু করেছিলেন। একটি প্রধান পর্যটন অবস্থা ধ্বংসের আশঙ্কায় স্থানীয় সরকার মমিগুলিকে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত কাচের শোকেসের পিছনে রেখে জাদুঘরটি পুনর্নির্মাণ করে।  

গুয়ানাজুয়াতোর বিখ্যাত মমিদের গল্প

কিছু ক্ষেত্রে এটা মনে করা হয় যে, ঘটনাক্রমে অনেককে জীবিত কবর দেওয়া হতে পারে, যার ফলে মুখের ভয়াবহ অভিব্যক্তি দেখা দেয়। যাইহোক, অনুভূত মুখের অভিব্যক্তিগুলি প্রায়শই পোস্টমর্টেম প্রক্রিয়ার ফলাফলেও হয়ে থাকে। জাদুঘরে অনেক বিখ্যাত মমি রয়েছে। এর মধ্যে সর্বাগ্রে আছেন ড. রেমিজিও লেরয়। তিনি ছিলেন একজন ফরাসি অভিবাসী। কোন পরিবার ছিল না তাই চিরস্থায়ী কবর রক্ষণাবেক্ষণ কর পরিশোধ করার জন্যও কেউ ছিল না। তাই নিয়মানুযায়ী, কর পরিশোধ না করায় তাকেও নির্বীজিত করা হয়। তিনিই প্রথম বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন। সর্বপ্রথম মমিটি তার, যেটা ১৮৬৫ সালে সংরক্ষিত। তিনি ছিলেন একজন ভাল ডাক্তার এবং একজন বিশিষ্ট নাগরিক। এইভাবে তাকে একটি আনুষ্ঠানিক, মার্জিত পোশাকের মধ্যে দাফন করা হয়েছিল যার বেশিরভাগই আশ্চর্যজনকরূপে ভালভাবে সংরক্ষিত ছিল।

এছাড়াও প্রদর্শনীতে জাদুঘর আরও রেখেছে পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট মমি, কলেরায় মারা যাওয়া তার মায়ের পাশে দাফন করা একটি ভ্রূণ। এটি এক দুঃখজনক প্রদর্শনী। 

 

অন্যতম কিংবদন্তি

এদের অন্যতম ইগনাসিয়া আগুইলার এখনও একজন কিংবদন্তি। ইগনাসিয়ার হার্টের অবস্থা করুণ ছিল যার কারণে তার হার্ট এমন ধীর হয়ে যায় যে তাকে মৃত মনে করা হয়। তার পরিবার বিশ্বাস করেছিল যে সে মারা গেছে। কলেরা ধারণ করার তাড়াহুড়োতে, তারা তাকে কবর দিয়ে দেয়। যখন তাকে নির্বীজিত করা হয় তখন তাকে কফিনে উল্টানো অবস্থায় পাওয়া যায়। মনে হয় যেন তার পিঠ দিয়ে কফিনের ঢাকনা খোলার চেষ্টা করছিল। তার হাত তার মাথার উপরে তুলে রাখা ছিল। এবং সে তার নিজের বাহু কামড়েছেন বলে দেখতে মনে হয় এবং তার মুখে রক্তও ​​পাওয়া গেছে।

কী ভয়ঙ্কর বিষয়টি। একজন জীবন্ত মানুষকে যেন কফিনে ঢুকিয়ে দাফন করা হয়েছে। হুশ ফিরে পাওয়ার পর সে নিজেকে আবিষ্কার করলো অন্ধকার কুঠুরিতে। চিৎ হয়ে পিঠ দিয়ে, মাথার উপরে হাত ভাঁজ করে কুঠুরির দরজা খোলার জোর চেষ্টা চালালো, আতঙ্কে নিজের বাহু কামড়ে রক্তাক্ত করলো, তবু মরতে হলো অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দী হয়ে। তার মুখের অভিব্যক্তি তো সেটাই প্রকাশ করবে। তবে অনেকেই বলে থাকেন, জাদুঘরের ব্যবসার খাতিরে গল্পটা রটানো হয়েছে, তবে সত্য কি তাই?   

 

১৮৩৩ সালে সেই ছোট উপনিবেশিক শহরে কলেরা মহামারীটি কেমন ছিল তা আমরা কল্পনা করতে পারব না। প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজনরা একের পর এক হতাহত হওয়ায় লোকেরা নিশ্চয়ই কী আতঙ্ক অনুভব করেছিল। "এর পরেরজন কি আমিই?" তারা নিশ্চয়ই ভেবেছে। কোন চিকিৎসা জ্ঞান ছাড়াই তারা কী সতর্কতা অবলম্বন করেছিল? তারা অবশ্যই সে আমলের কুসংস্কারের প্রতি মরিয়া হয়ে পড়েছিল। চিরস্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ কর ১৯৫৮ সালে নির্মূল করা হয়। কিন্তু মমি প্রদর্শনী এবং চিৎকার করা লাশের ছবিগুলি টিকে থাকে। এখানে প্রায় ১২০ টি মমি আছে যাদের মধ্যে ৫৯ টি প্রদর্শিত হয়েছে। আজ পর্যন্ত গুয়ানাজুয়াতোর মমিগুলি শহরের জন্য একটি প্রধান পর্যটক আকর্ষণ হিসাবে অব্যাহত রয়েছে। Guanajuato সত্যিই তার Guanajuato Mummies জাদুঘর প্রচার করার জন্য উদ্ভাবনী উপায় খুঁজে পেয়েছে। 

 

১৯৮৮ সালে গুয়ানাজুয়াতোকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে নামকরণ করা হয়। এটি মধ্য মেক্সিকোর অন্যতম সুন্দর ঔপনিবেশিক শহর এবং একটি প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।